
নিজস্ব প্রতিবেদক:
সরকারি চাকরিতে প্রায় এক যুগ। পদ ঢাকা কর অঞ্চল-৫-এর সার্কেল-৯৯-এর উচ্চমান সহকারী। অথচ তাঁকে ঘিরে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে উঠে এসেছে জমি, বিলাসবহুল বাড়ি, গরুর খামার এবং স্ত্রী ও স্বজনদের নামে ব্যাংক আমানতসহ বিপুল সম্পদের হিসাব। অভিযোগ অনুযায়ী, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ১৩ কোটি ৭ লাখ টাকা; এর বাইরে স্ত্রী ও নিকটাত্মীয়দের নামে ব্যাংক, এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রে আরও প্রায় ৫ কোটি টাকার সম্পদের দাবি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আলোচনায় প্রায় ১৮ কোটি টাকার সম্পদ। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে করদাতাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে ঘুষ গ্রহণ এবং জমি দখলের অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা, সম্পদের প্রকৃত মালিকানা এবং অর্থের উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি ইত্তেহাদ নিউজ, দৈনিক সমবাংলা, আজকের সংবাদসহ কয়েকটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে সাইফুল ইসলামকে ঘিরে সম্পদ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে সম্পদের হিসাব, জমি, বাড়ি, গরুর খামার এবং করদাতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে সম্পদের পরিমাণে পার্থক্য রয়েছে—কোথাও প্রায় ১৮ কোটি, কোথাও ২০ কোটি টাকার হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণে মূল অভিযোগপত্র, দলিল, ব্যাংক নথি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি।
সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর দাবি অনুযায়ী, টাঙ্গাইলের গোপালপুরের বাসিন্দা সাইফুল ইসলামের নামে ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পদের তালিকায় রয়েছে জমি, বাড়ি ও গরুর খামার। তাঁর বাড়ির নির্মাণব্যয় প্রায় ২ কোটি টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় জমি এবং স্ত্রী ও নিকটজনদের নামে আর্থিক সম্পদের বিবরণ সামনে এসেছে।
কিন্তু এসব সম্পদের কোনটি তাঁর নিজস্ব, কোনটি পরিবারের অন্য সদস্যদের এবং কোনটি যৌথ বা অন্য কোনো বৈধ উৎসে অর্জিত—তা নির্ধারণের জন্য দলিল ও আর্থিক নথি পরীক্ষা প্রয়োজন। সম্পদের বাজারমূল্য নির্ধারণেও জমির অবস্থান, ক্রয়কাল, দলিলে উল্লেখিত মূল্য এবং বর্তমান বাজারদরের পার্থক্য বিবেচনায় নিতে হবে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, অভিযোগে উল্লেখ করা সম্পদ অর্জনের সময়কাল, তাঁর চাকরিজীবনের বৈধ আয়, পারিবারিক আয় এবং ঘোষিত সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না। এ প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব এবং সম্পত্তির নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব।
করদাতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগের আরেকটি গুরুতর দিক হলো, করদাতাদের বিভিন্ন করসংক্রান্ত জটিলতা ও নথিপত্রের সমস্যা দেখিয়ে চাপ প্রয়োগ এবং অর্থ আদায়। অভিযোগকারীদের দাবি, কর কমিশনার ও ডেপুটি কর কমিশনারের নাম ব্যবহার করে করদাতাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগগুলো সত্য হলে তা কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সাধারণ করদাতাদের সুরক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তবে কার কাছ থেকে, কখন, কী অজুহাতে এবং কত টাকা নেওয়া হয়েছে—এ বিষয়ে নির্দিষ্ট অভিযোগকারী, লেনদেনের নথি, ব্যাংক রেকর্ড, বার্তা বা অন্য কোনো সমর্থনযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা সহজ হবে।
একই সঙ্গে যেসব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, সেটিও আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারও নাম ব্যবহার করার অভিযোগ উঠলেই ওই কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
জমি দখল ও পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ
প্রকাশিত অভিযোগে কবরস্থানসংলগ্ন জমি জোরপূর্বক দখল এবং পারিবারিক বিরোধে তিন ভাইকে বঞ্চিত করে বাবার সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেওয়ার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে জমির খতিয়ান, দলিল, নামজারি, দখলসংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট কোনো মামলা থাকলে তার কাগজপত্র পরীক্ষা করা জরুরি।
বিশেষ করে জমি হস্তান্তর বৈধভাবে হয়েছে কি না, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মতি ছিল কি না এবং কোনো আদালতের আদেশ বা বিরোধ রয়েছে কি না—এসব তথ্য ছাড়া কাউকে জমি দখলকারী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।
তদন্তের দাবি, প্রয়োজন নথিভিত্তিক যাচাই
অভিযোগগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চল এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে বিষয়গুলো যাচাইয়ের দাবি উঠতে পারে। তবে তদন্ত বা অভিযোগ দাখিলের বাস্তব অবস্থা নিশ্চিত না করে কোনো সংস্থা ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে কিংবা মামলা হয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়।
নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের স্বার্থে সাইফুল ইসলামের চাকরিতে যোগদানের তারিখ, পদ ও বেতনসংক্রান্ত তথ্য, সম্পদ বিবরণী, আয়কর রিটার্ন, জমির দলিল, বাড়ি নির্মাণের ব্যয় এবং স্ত্রী ও স্বজনদের নামে থাকা আর্থিক সম্পদের বৈধ উৎস যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযোগে উল্লিখিত করদাতাদের বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক নথি সংগ্রহ করা দরকার।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সাইফুল ইসলামের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
Leave a Reply