
১১টি আইটি প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, ডিপিএম পদ্ধতিতে ক্রয়, জমি অধিগ্রহণ ও বিনিয়োগকারীদের চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন.?
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের উপ-প্রকল্প পরিচালক (বিনিয়োগ) শাহরিয়ার আল হাসানকে ঘিরে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, জমি অধিগ্রহণ এবং বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা দাবির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর দায়িত্ব পালনকালে ১১টি আইটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা পরিবর্তন করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) অনুসরণের মাধ্যমে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা ও আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
১১ প্রকল্পে ডিপিএম, ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন
প্রাপ্ত অভিযোগে বলা হয়েছে, তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি চক্রের মাধ্যমে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ১১টি আইটি প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করা হয়। প্রকল্পের মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিবর্তন করে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ প্রক্রিয়ায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যায় এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
শাহরিয়ার আল হাসান এসব প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়ের হিসাব, ক্রয়সংক্রান্ত নথি, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেন যাচাই ছাড়া অভিযোগের আর্থিক দিক চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
জমি অধিগ্রহণ ও প্রকল্পের স্থান নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ
হাই-টেক পার্কের বিনিয়োগ শাখা এবং জমি অধিগ্রহণ-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশে জমি নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের প্রভাব ব্যবহারের মাধ্যমে অতিরিক্ত মূল্যে জমি কেনা এবং কমিশন গ্রহণের অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু প্রকল্পের স্থান নির্বাচন ও জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন থাকায় সংশ্লিষ্ট পার্কগুলোর কার্যক্রম প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোয়নি। তবে জমির মূল্যায়ন, অধিগ্রহণের অনুমোদন, বাজারদর এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা জরুরি।
আদাবরে ফ্ল্যাট, বসিলায় জমি ও সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, শাহরিয়ার আল হাসান রাজধানীর আদাবর এলাকায় একটি আলিশান ফ্ল্যাট গড়ে তুলেছেন এবং মোহাম্মদপুরের বসিলায় জমি কিনেছেন। তাঁর জ্ঞাত আয়, চাকরির বেতন এবং ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
এ ছাড়া কারওয়ান বাজার সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের সামনে কাঁচাবাজার থেকে নিয়মিত চাঁদা ও ভাড়া আদায়ের জন্য নিজস্ব লোক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পক্ষে সম্পত্তির দলিল, আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন কিংবা ভাড়া ও অর্থ আদায়ের প্রমাণ প্রকাশ্যে যাচাই করা না গেলে সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ও প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ
প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে শাহরিয়ার আল হাসান গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ পান। এ ছাড়া গাজীপুরের সাবেক সংসদ সদস্য সিমিন হোসেন রিমির সঙ্গে আত্মীয়তার পরিচয় ব্যবহার করে প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে।
তাঁর অফিসকক্ষে আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ নেতাদের ছবি রাখা এবং পারিবারিক অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের উপস্থিতির বিষয়টিও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিতি নিজে থেকে দুর্নীতির প্রমাণ নয়। এসব সম্পর্কের সঙ্গে সরকারি সিদ্ধান্ত বা আর্থিক অনিয়মের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র আছে কি না, তা নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলায় নাম থাকার দাবি
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় শাহরিয়ার আল হাসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনবিরোধী বক্তব্য প্রচার করেছিলেন। পরে এসব বক্তব্য মুছে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া তেজগাঁও থানায় দায়ের করা গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট একটি মামলায় তাঁকে ১৬ নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করার দাবি করা হয়েছে।
তবে মামলার এজাহারের অনুলিপি, মামলার নম্বর, সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো এবং তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করা জরুরি। কোনো মামলায় আসামি হিসেবে নাম থাকা অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য নয়।
ডিজিটাল ডিভাইস এক্সপো ও বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ
চলতি বছরের ‘ডিজিটাল ডিভাইস এক্সপো’ আয়োজন ঘিরেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আয়োজনের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল এবং বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির পক্ষ থেকেও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে অর্থের পরিমাণ, ব্যয়ের হিসাব, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লিখিত অভিযোগ এবং কর্তৃপক্ষের তদন্তের তথ্য যাচাই ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
অন্যদিকে, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও যশোর হাই-টেক পার্কে নতুন বিনিয়োগকারীদের চুক্তি যাচাই, জমি বরাদ্দের অনুমোদন এবং দখল হস্তান্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে অবৈধ সুবিধা দাবির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েকজন বিনিয়োগকারী আর্থিক লেনদেনে রাজি না হওয়ায় তাঁদের চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া ঝুলে রয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে বিনিয়োগ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের বক্তব্য, চুক্তির নথি এবং ফাইল নিষ্পত্তির সময়সীমা যাচাই করে বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের দাবি, ১১টি প্রকল্পের ডিপিপি পরিবর্তন, ডিপিএম পদ্ধতিতে ক্রয়, প্রকল্প ব্যয়ের হিসাব, জমি অধিগ্রহণের মূল্যায়ন, বিনিয়োগকারীদের চুক্তি, এক্সপোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সম্পদের উৎস নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট নথি নিরীক্ষা করে সরকারি অর্থের কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
শাহরিয়ার আল হাসানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে শাহরিয়ার আল হাসানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক নিষ্পত্তি জরুরি। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, প্রকল্পের নথি এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র সামনে আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
Leave a Reply