
১২ বছরের চাকরিতে বিপুল সম্পদের অভিযোগ, দুই মাসে এস এ পরিবহনে ৫৪.৫০ লাখ টাকা পাঠানোর তথ্য; বিভিন্ন কর্মস্থলে ঘুষ-অনিয়মের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের রাজস্ব কর্মকর্তা তুহিন চৌধুরীর নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার বারোঘর গ্রামে বাড়ি, জমি, মাছের ঘের এবং রাজধানীর গুলশানে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটসহ বিভিন্ন সম্পদের তথ্য সামনে আসায় তাঁর আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি যশোর, ঢাকা বন্ড কমিশনারেট, তামাবিল ও চট্টগ্রাম কাস্টমসে দায়িত্ব পালনকালে ঘুষ, অনিয়ম, ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে।
অনুসন্ধানী সূত্রের দাবি, নেত্রকোনায় তাঁর নামে কোটি টাকা মূল্যের ডুপ্লেক্স বাড়ি, গোয়েলা রোডে প্রায় ২০ শতক জমির ওপর বাড়ি, একাধিক মাছের ঘের এবং প্রায় ১৫–২০ একর জমি রয়েছে। এসব জমির আনুমানিক বাজারমূল্য ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া গুলশানে ৯–১০ কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট, রাজধানীর আশপাশে আরও ফ্ল্যাট এবং ব্যাংক ব্যালান্স ও এফডিআর থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে সম্পদের প্রকৃত মালিকানা ও মূল্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
শিক্ষক পরিবার থেকে বিপুল সম্পদের মালিক!
তুহিন চৌধুরী ২০১৪ সালে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। তাঁর বাবা চন্দন চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং মা নিলিমা দেবনাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। তাঁর ভাইবোনদেরও শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। পরিবারের সদস্যদের নামেও বিপুল জমি ও সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, একটি শিক্ষক পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস কী?
যশোর থেকে বন্ড কমিশনারেট—ঘুষের অভিযোগ
চাকরির প্রথম কর্মস্থল যশোর ভ্যাট কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ ওঠে তুহিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে। ২০১৬ সালে ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে বদলির পর ফাইল আটকে রাখা, ছাড়পত্রের বিনিময়ে অর্থ দাবি এবং ব্যবসায়ীদের হয়রানির অভিযোগও পাওয়া যায়। ওই সময়ে তাঁকে ছয় মাসের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে বরখাস্তের কারণ ও বিভাগীয় সিদ্ধান্তের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
তামাবিলে আটক, চট্টগ্রামে সিন্ডিকেটের অভিযোগ
সিলেটের তামাবিল শুল্ক স্টেশনে দায়িত্ব পালনকালে ট্রাকপ্রতি ৫০ হাজার টাকা আদায়, মদসহ বিজিবির হাতে আটক হওয়া এবং অবৈধ ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে দায়িত্ব পালনকালে পণ্য খালাস, ফাইল নিষ্পত্তি ও আমদানি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ ওঠে। কয়েকজন সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ীর দাবি, সেখানে দুই বছর দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিপুল অর্থ অবৈধভাবে আয় করেন। ২০২৪ সালে একটি আমদানি চালানের শুল্কায়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগেও তাঁর নাম এসেছে বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে শুল্ক গোয়েন্দার প্রতিবেদন, চালানের নথি ও বিভাগীয় তদন্তের তথ্য প্রয়োজন।
দুই মাসে এস এ পরিবহনে ৫৪.৫০ লাখ টাকা!
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত মাত্র দুই মাসে এস এ পরিবহনের মাধ্যমে ১৩টি চালানে মোট ৫৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেত্রকোনায় পাঠানো হয়। এ ছাড়া শিশির চৌধুরীর নামে প্রায় সাত লাখ টাকা মূল্যের ইলেকট্রনিক সামগ্রী পাঠানোর তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। শিশির চৌধুরী তুহিন চৌধুরীর ভাই বলে সূত্র জানিয়েছে।
নেত্রকোনার রতন নামের এক ব্যক্তি প্রতিবেদককে বলেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তুহিন স্যারের পাঠানো টাকা তিনি এস এ পরিবহন থেকে গ্রহণ করে তাঁর নির্দেশিত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিতেন। তবে এসব অর্থের প্রকৃত উৎস, মালিকানা ও পাঠানোর উদ্দেশ্য নিশ্চিত করতে চালানের মূল কপি এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি যাচাই করা জরুরি।
সম্পদের উৎস নিয়ে তদন্তের দাবি
তুহিন চৌধুরীর নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদ, ব্যাংক আমানত এবং বিভিন্ন কর্মস্থলে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। তাঁর সম্পদের পরিমাণ বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নির্ধারণে সম্পদ বিবরণী, আয়কর রিটার্ন, জমির দলিল ও ব্যাংক লেনদেন পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তুহিন চৌধুরীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি
প্রতিবেদন তৈরির সময় অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে তুহিন চৌধুরীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে অপর প্রান্ত থেকে তাঁর ভাই পরিচয়ে একজন ফোন রিসিভ করেন। তিনি প্রতিবেদককে জানান, তুহিন চৌধুরী অসুস্থ। ফলে এ প্রতিবেদনে উত্থাপিত সম্পদ অর্জন, আর্থিক লেনদেন ও বিভিন্ন কর্মস্থলে অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর সরাসরি বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহ প্রকাশ করা হবে।
Leave a Reply