
দলিলেই কোটি কোটি টাকার সম্পদের দাবি, পার্ক-ফ্ল্যাট ও ব্যাংক লেনদেন ঘিরে অভিযোগ; চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আদায়ের দাবিও- বক্তব্য চাইতে গিয়ে সাংবাদিকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | দ্বিতীয় পর্ব
নিজস্ব প্রতিবেদক:
“শুধু নিউজ না, আমার এ বিষয়টা আপনারা প্রধানমন্ত্রীকে জানান, তারপরও আমার কিছু হবে না। আমি এগুলো নিউজের পরোয়া করি না”—গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের হিসাব সহকারী মো. মনির হোসেনের বিরুদ্ধে এমন বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার জমি, পার্ক, ফ্ল্যাট, ব্যাংক লেনদেন এবং সরকারি চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গিয়ে জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্টের স্টাফ রিপোর্টার আবু জাফর মন্ডলের সঙ্গে তিনি অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ।
একজন সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর সাংবাদিকের কাছে এমন বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—তাঁর এই আত্মবিশ্বাসের উৎস কোথায়? অভিযোগগুলো তদন্ত হলে তাঁর কিছুই হবে না—এমন ধারণার ভিত্তি কী? তিনি কি আইনের ঊর্ধ্বে? অবশ্য কথিত বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট ও অভিযুক্তের ব্যাখ্যা যাচাই করা জরুরি; বক্তব্যটি নিজে থেকে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করে না।
প্রথম পর্বে অভিযোগকারী রেজাউল করিমের সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, মনির হোসেনের নামে এবং তাঁর মা, স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার মদনের পাড়া ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পূর্ব ছাপরহাটি এলাকায় একাধিক জমি কেনা ও মালিকানা হস্তান্তরের বিবরণ তুলে ধরা হয়। অভিযোগপত্রে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দলিলের উল্লেখ রয়েছে। কয়েকটি জমির দলিলমূল্যের তুলনায় বর্তমান বাজারমূল্য অনেক বেশি বলে অভিযোগকারীর দাবি। তবে সব দলিলের তথ্য, জমির মালিকানা ও বাজারমূল্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা এখনো জরুরি।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, মদনের পাড়া এলাকায় পার্কসংশ্লিষ্ট সম্পদের মূল্য প্রায় ৯ থেকে ১০ কোটি টাকা। বগুড়ার উপশহরে একটি ফ্ল্যাটের আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, সেখানে প্রায় ১০ শতাংশ জমির মূল্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং গাইবান্ধা পৌর এলাকায় সাত শতাংশ জমির মূল্য ৯০ লাখ টাকা বলে উল্লেখ রয়েছে। এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য যাচাই না করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
অন্যদিকে, জনতা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় মনির হোসেন, তাঁর আত্মীয়স্বজন এবং অন্য ব্যক্তিদের হিসাবের মাধ্যমে কোটি টাকার লেনদেনের দাবি করা হয়েছে। সরকারি চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকা করে নেওয়া, চাকরি না হলেও অর্থ ফেরত না দেওয়া এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের পক্ষে ব্যাংক নথি, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ, কথিত ভুক্তভোগীদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট দলিল যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগপত্রে মনির হোসেনের দ্বিতীয় স্ত্রী নিশাত রিমার পারিবারিক বিরোধসংক্রান্ত অভিযোগ এবং রংপুরের আদালতে মামলা চলমান থাকার কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে মামলার নম্বর, বর্তমান অবস্থা ও আদালতের নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। পারিবারিক বিরোধের অভিযোগকে আর্থিক দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে সরাসরি বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে দপ্তরের বক্তব্য জানতে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি বলে প্রতিবেদক জানিয়েছেন। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফোন রিসিভ না করার কারণ জানা যায়নি; তাই এটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে বক্তব্য এড়িয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
এখন প্রশ্ন, অভিযোগপত্রে উল্লিখিত জমির দলিল, সম্পদের মালিকানা, ব্যাংক লেনদেন এবং চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আদায়ের দাবিগুলো যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে? অভিযোগকারী জানিয়েছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়ে সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি করেছেন। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং তদন্তের অগ্রগতি সংশ্লিষ্ট নথি থেকে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সরকারি চাকরিতে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন; একইভাবে অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। তাই মনির হোসেনের সম্পদের উৎস, আর্থিক লেনদেন ও চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং তাঁর বক্তব্যসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা প্রকাশ করা জরুরি। ‘প্রধানমন্ত্রীকে জানালেও কিছু হবে না’—এমন বক্তব্যের অভিযোগের ব্যাখ্যা কী এবং সম্পদের উৎস সম্পর্কে মনির হোসেনের বক্তব্য কী—সেই উত্তর এখন জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক নথি পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
Leave a Reply