
বাড়িওয়ালার মাধ্যমে জাহিদের চলে যাওয়া, এরপরই বিষপান করে মৃত্যু—নেপথ্যে কারা? তদন্তের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর:
আট বছর পর প্রবাস থেকে দেশে ফিরেছিলেন স্বামী জাহিদ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর স্বামীকে কাছে পেয়ে স্ত্রী শিরিন আক্তার (২৮) ভেবেছিলেন, হয়তো এবার তাদের সংসারে ফিরবে স্বাভাবিকতা। কিন্তু সেই আশা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তৈরি হয় মনোমালিন্য। একপর্যায়ে জাহিদ আবার অন্যত্র চলে যেতে চাইলে শিরিন তাকে বাসায় রেখে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেন।
পরিবারের অভিযোগ, এ সময় বাড়িওয়ালা শাহীন মিয়া বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে জাহিদকে বাসা থেকে চলে যেতে সহযোগিতা করেন। আর স্বামীকে আবার হারানোর সেই চরম মানসিক আঘাতের পরই বিষাক্ত দ্রব্য পান করেন শিরিন। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।
এখন প্রশ্ন—শিরিন কি শুধু নিজের সিদ্ধান্তেই মৃত্যুর পথ বেছে নিয়েছিলেন, নাকি তার মৃত্যুর পেছনে দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, পারিবারিক টানাপোড়েন ও ঘটনাপ্রবাহের কোনো ভূমিকা ছিল?
ঘটনাটি ঘটে গত ৩০ আগস্ট সন্ধ্যায়। শিরিন নিজ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। পরে স্থানীয়রা কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করেন। পরিবারের দাবি, তিনি তেলাপোকা মারার বিষাক্ত ওষুধ পান করেছিলেন।
মুমূর্ষু অবস্থায় প্রথমে তাকে টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, সেখানে বিষপানের রোগীর প্রয়োজনীয় ওয়াশের ব্যবস্থা না থাকায় তাকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে নেওয়ার পথেই শিরিনের মৃত্যু হয়।
তার মরদেহ বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে বলে পরিবার জানিয়েছে।
স্বামীকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন, তারপরই ভেঙে গেল সব
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় আট বছর আগে প্রবাসে যান জাহিদ। এ সময় স্ত্রী শিরিন ও তাদের একমাত্র সন্তানের সঙ্গে তার যোগাযোগ ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়ে পরিবারের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। এর মধ্যে জাহিদ প্রথম স্ত্রী শিরিনকে রেখে আরও দুটি বিয়ে করেছেন—এমন তথ্য শিরিন ও তার পরিবারের কাছে পৌঁছে যায় বলে অভিযোগ।
দেশে ফেরার খবর পেয়ে শিরিন স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাকে বাসায় আসতে বলেন। কিন্তু জাহিদ প্রথমে বাসায় আসতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। পরিবারের দাবি, তিনি বলেন—বাড়িওয়ালা তার দায়িত্ব নিলে তবেই তিনি বাসায় আসবেন।
পরে বাড়িওয়ালা শাহীন মিয়ার মাধ্যমে জাহিদকে বাসায় আনা হয়। তিনি সেখানে এক রাত অবস্থান করেন। কিন্তু পরদিন থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়।
সালিশের বদলে চলে যাওয়ার সুযোগ?
শিরিনের পরিবার বলছে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ তৈরি হওয়ার পর শিরিন চেয়েছিলেন জাহিদকে বাসায় রেখে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করতে। কিন্তু সে সুযোগ তৈরি হওয়ার আগেই জাহিদ অন্যত্র চলে যেতে চান।
পরিবারের অভিযোগ, বাড়িওয়ালা শাহীন মিয়া চাইলে দুই পক্ষকে বসিয়ে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি কোনো ঝামেলায় জড়াতে না চেয়ে জাহিদকে বাসা থেকে চলে যেতে সহযোগিতা করেন।
এরপরই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন শিরিন।
তবে বাড়িওয়ালা শাহীন মিয়া আসলে কী ভূমিকা রেখেছেন, তিনি জাহিদকে কীভাবে এবং কেন বাসা থেকে চলে যেতে সহযোগিতা করেছেন—এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও তদন্তের দাবি
শিরিনকে প্রথমে টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পর কী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল, তার শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল, বিষপানের রোগী হিসেবে জরুরি কোনো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব ছিল কি না এবং অন্য হাসপাতালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত কত দ্রুত নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।
চিকিৎসা নথি, জরুরি বিভাগের রেজিস্টার, কর্তব্যরত চিকিৎসকদের বক্তব্য এবং রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার সময়কার পরিস্থিতি যাচাই করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
‘আত্মহত্যা’ বলেই কি তদন্ত শেষ?
শিরিনের মৃত্যু আপাতদৃষ্টিতে বিষপানে আত্মহত্যার ঘটনা হলেও পরিবারের অভিযোগ ও ঘটনার ধারাবাহিকতায় একাধিক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
আট বছর পর স্বামীর দেশে ফেরা—স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব—জাহিদের একাধিক বিয়ের অভিযোগ—স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ—বাড়িওয়ালার মাধ্যমে জাহিদকে বাসায় আনা—পরে তার চলে যাওয়া—এরপর শিরিনের বিষপান এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু।
ঘটনার প্রতিটি ধাপই এখন তদন্তের দাবি রাখে।
বিশেষ করে জাহিদ ও শিরিনের মধ্যে শেষবার কী কথা হয়েছিল, জাহিদকে বাসা থেকে চলে যেতে শাহীন মিয়া কী ভূমিকা রেখেছিলেন, ঘটনার আগে শিরিনের সঙ্গে কারও কোনো বিরোধ বা যোগাযোগ হয়েছিল কি না এবং বিষপানের পর চিকিৎসা পেতে কোনো বিলম্ব হয়েছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি।
তদন্ত চায় পরিবার
শিরিনের পরিবারের দাবি, ঘটনাটিকে শুধু আত্মহত্যা হিসেবে দেখলে প্রকৃত কারণ আড়ালে থেকে যেতে পারে। তারা স্বামী জাহিদ, বাড়িওয়ালা শাহীন মিয়া এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, কেউ যদি শিরিনকে মানসিকভাবে এমন অবস্থায় ঠেলে দিয়ে থাকে, কিংবা তার মৃত্যুর আগে বা পরে কোনো ধরনের দায়িত্বহীনতা বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড করে থাকে, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে তা বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি পরিবারের আহ্বান—শিরিনের মৃত্যুর ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হোক। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের বক্তব্য, স্বামী জাহিদ ও বাড়িওয়ালা শাহীন মিয়ার ভূমিকা, হাসপাতালের চিকিৎসা নথি এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক তথ্য যাচাই করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হোক।
একজন ২৮ বছরের তরুণীর এমন মৃত্যু যেন কেবল একটি ‘আত্মহত্যা’র পরিসংখ্যানে হারিয়ে না যায়—ঘটনার নেপথ্যে প্রকৃত সত্য কী, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
Leave a Reply