রাঙামাটির বন বিভাগে ৩০ লাখ টাকার বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ, কাঠ ও সম্পদের সাম্রাজ্য ঘিরে তোলপাড়
নিজস্ব প্রতিবেদক:
পার্বত্য জেলা রাঙামাটির বন বিভাগে বদলি বাণিজ্য, কথিত ঘুষ লেনদেন, জোত পারমিটের অনিয়ম এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ডেপুটি রেঞ্জার বাবুরাম চাকমা, যাঁকে স্থানীয় বন বিভাগের আলোচনায় ‘বনের রাজা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন, অবৈধ কাঠের ব্যবসা এবং সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বন সংরক্ষক (সিএফ) আবদুল আউয়াল সরকার ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) হক মাহমুদ মোর্শেদের বিরুদ্ধে মোট ৩০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীন তদন্ত ও প্রামাণ্য নথির মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
বদলি বাণিজ্যে ৩০ লাখ টাকার অভিযোগ
প্রাপ্ত অভিযোগ অনুযায়ী, ঝুম নিয়ন্ত্রণ বন বিভাগের মেরুং রেঞ্জ থেকে রাঙামাটির অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চল বনায়ন বিভাগে পদায়ন পেতে সিএফ আবদুল আউয়াল সরকারকে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে, কুতুকছড়ি রেঞ্জে রেঞ্জার হিসেবে পদায়নের অগ্রিম আদেশ নিশ্চিত করতে ডিএফও হক মাহমুদ মোর্শেদকে ২৫ লাখ টাকা উৎকোচ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দুটি অভিযোগের অঙ্ক মিলিয়ে মোট ৩০ লাখ টাকা। এসব দাবির সত্যতা যাচাইয়ে বদলির আদেশ, দাপ্তরিক নথি, পদ শূন্য থাকার তথ্য এবং কথিত আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পরীক্ষা করা জরুরি।
অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের বিভিন্ন রেঞ্জ ও চেক স্টেশনে প্রভাব বিস্তার করে বাবুরাম চাকমা বদলি ও পদায়নসংক্রান্ত সুবিধা আদায় করছেন। পাশাপাশি ভুয়া বা অনিয়মপূর্ণ জোত পারমিটের মাধ্যমে কাঠ আহরণ এবং বনাঞ্চলের ক্ষতিসাধনের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে তোলা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট পারমিট ও বনজ সম্পদ পরিবহনের নথি যাচাই ছাড়া এসব অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
দুদক কর্মকর্তার স্বামীর পরিচয় ঘিরে প্রশ্ন
বাবুরাম চাকমার স্ত্রী দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন সহকারী পরিচালক বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। স্ত্রীর পেশাগত পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে তিনি বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করছেন—এমন দাবিও করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীন প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। কারও পারিবারিক পরিচয় নিজে থেকেই অনিয়মের প্রমাণ নয়।
গাড়ি, বাড়ি ও পাহাড়ি জমির মালিকানা নিয়ে অভিযোগ
বাবুরাম চাকমার বিরুদ্ধে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি শহরে একাধিক বহুতল ভবন, বিপুল পরিমাণ পাহাড়ি জমি ও বাগানের মালিকানা থাকার অভিযোগ রয়েছে। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক পর্যটন রুটে তাঁর ১০টি বাণিজ্যিক গাড়ি চলাচল করে বলেও দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া খাগড়াছড়ি শহরে চারতলাবিশিষ্ট তিন ইউনিটের একটি বাড়ি থেকে মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা ভাড়া পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদ ও ব্যবসার কিছু অংশ ভাগিনা এবং নিকটাত্মীয়দের নামে পরিচালিত হচ্ছে। সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়ের অর্থের উৎস, আয়কর বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে এসব দাবির সত্যতা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
বন বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বদলি ও পদায়ন নিয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ এবং বনজ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের দাবি জনস্বার্থে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা, কথিত ঘুষের লেনদেন, জোত পারমিটের বৈধতা এবং অভিযোগে উল্লিখিত সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন সচেতন মহল।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে বাবুরাম চাকমা, সিএফ আবদুল আউয়াল সরকার ও ডিএফও হক মাহমুদ মোর্শেদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা সংযোজন করা হবে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।